ক’দিন ধরেই উনাকে খুব মনে পড়ছিল। কী চমৎকার একজন মানুষ!
আমার লেখা পড়ে আমাকে দেখতে এসেছিলেন। তারপর একপ্রকার জোর করেই উনার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটের স্যান্ডিয়াগোতে উনাদের বাড়ি। ছোট্ট পাহাড়ের ওপর সাদা রঙের সেই বাড়ি থেকে দেখা যেত প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল। বাড়ির বারান্দায় নির্ভয়ে বাসা বেঁধেছিল চড়ুই পাখি। দিনভর বাড়ির আঙিনা জুড়ে ফুল আর পাতাবাহারের যত্ন নিতেন। আরও কত শত বন্য পাখির আনাগোনায় মুখরিত থাকত পুরো বাড়িটা। পাখিগুলো বোধহয় ভাবত—এটা ওদেরই বাড়ি!
ওদের মতো আমিও যেদিন সেই বাড়িতে পা রাখলাম, কেমন যেন এক প্রশান্তির বাতাস কপাল ছুঁয়ে গেল। তারপর যে ক’টা দিন ছিলাম, সারাদিন উনার পিছু পিছু ঘুরতাম। ঠিক অনেকদিন পর বাড়ি ফেরা সন্তানের মতো—যেমন মায়ের আঁচল ধরে থাকে। মেক্সিকো বর্ডারঘেঁষা ক্যালিফোর্নিয়ায় উনার অনেক গল্প জমে ছিল। হয়তো বলার মানুষ ছিল না। তাই সুখ-দুঃখের অনেক গল্পই শেয়ার করেছিলেন আমার সঙ্গে। আমিও মন দিয়ে শুনতাম। আর ভাবতাম—মানুষের জীবন কতই না বিচিত্র! কতই না অদ্ভুত!
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্কলারশিপে আমরা একটা দল গিয়েছিলাম স্যান্ডিয়াগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানে আমাদের বানানো কিছু ফিল্মের প্রদর্শনীতে উনার সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি উনাকে “আন্টি” বলেই সম্বোধন করেছিলাম। আমি তখন স্টুডেন্ট, পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রতিদিনে কাজ করি এবং বাংলা ব্লগেও নিয়মিত লিখি। আমার লেখা উনি খুব পছন্দ করেছিলেন। সম্ভবত সে সুবাদেই আমাদের বাংলাদেশি টিমে আমিই উনার স্নেহধন্য হয়েছিলাম।
শুনেছি, প্রত্যেকটি সম্পর্ক ও পরিচয়ের পেছনে আল্লাহ নাকি একটি মহৎ উদ্দেশ্য লিখে রাখেন।
উনাকে আজ কেন এত মনে পড়ছে, সেটা বলার আগে উনাকে আরেকটু পরিচয় করিয়ে দিই আপনাদের সঙ্গে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকাকালে একদিন দীর্ঘ পথ ড্রাইভ করে স্যান্ডিয়াগো থেকে উনি আমাকে নিয়ে গেলেন লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে। সেখানেও সারি সারি কাঠের দোতলা বাড়ি। প্রতিটি বাড়ি দেখতে প্রায় একই রকম—ধবধবে সাদা। চারপাশে কমলা লেবুর গাছ। সবুজ পাতার ফাঁকে হলদেটে রসালো কমলাগুলো হাসছিল যেন। মনে আছে, ফলের ভারে নুয়ে পড়া ডাল দেখতে দেখতে আমরা ভুল করে এক বাড়িতে ঢুকে পড়েছিলাম। পরে বুঝতে পেরে আবার দিক পরিবর্তন করলাম।
তারপর কিছুদূর হেঁটে হঠাৎ থমকে গেলাম। ভিনদেশে ইংরেজির রাজত্বের মাঝখানে একটি ছোট্ট বাড়ি থেকে ভেসে আসছিল বাংলা গানের সুর—
“আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে...
দেখতে আমি পাইনি তোমায়...”
সেই গানই যেন আমাদের গন্তব্য চিনিয়ে দিল। ওটা ছিল আন্টির একমাত্র ছোট বোনের বাসা।
বাড়িতে ঢুকে দেখলাম, উনার ছোটবোন রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা করছিলেন। আমাদের দেখেই হাসিমুখে স্বাগত জানালেন। প্রথম দেখাতেই তাঁর চেহারায় এক দুর্লভ ব্যক্তিত্বের ছাপ খুঁজে পেয়েছিলাম। উনারা দুই বোনই অসম্ভব মেধাবী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের অমায়িক মানুষ। তাঁদের প্রাইভেসির কথা ভেবে পুরো পরিচয় উহ্য রাখছি।
যাইহোক, উনার এই বোনের বাড়ি থেকেই পরদিন উনি আমাকে নিয়ে গেলেন হলিউডের ইউনিভার্সাল স্টুডিও দেখতে। এখনও মনে আছে, ইউনিভার্সাল স্টুডিওর গেট থেকেই বিদায় নিয়েছিলেন আন্টি। সকাল থেকে মধ্যদুপুর পর্যন্ত একা একা হলিউড ঘুরে আমি যখন ক্ষুধার্ত-ক্লান্ত, তখন কাঁধের ব্যাগ খুলে দেখি—একটি বক্সে আমার জন্য দুপুরের খাবারও দিয়ে দিয়েছেন। ফ্রাইড রাইস আর সঙ্গে একটি অ্যাভোকাডো।
আমার হাতে তেমন টাকা-পয়সা ছিল না। তাই হলিউডের টিকিটটাও উনিই কেটে দিয়েছিলেন। আমি কিছুতেই নেব না—তারপরও একপ্রকার জোর করেই আমার হাতে ১০০ ডলার গুঁজে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন,
“এটা নাও। এখন তুমি স্টুডেন্ট। হয়তো একদিন টাকা হবে, কিন্তু এখানে আসার সুযোগ হবে না। যেহেতু এসেছ, দেখে যাও।”
সন্ধ্যা নাগাদ আবার উনিই আমাকে হলিউডের গেট থেকে পিক করেছিলেন।
দেশে ফিরে আসার পর নিয়ম করে আর যোগাযোগ হয়নি। তবে মাঝেমধ্যে কথা হতো। আমি বুঝতাম—কথা না হলেও আমাদের যোগাযোগ হতো। সম্ভবত এক অদৃশ্য স্নেহের বাঁধনে বেঁধে রেখেছিলেন আমাকে। মাঝে মাঝে ফোন করে বলতেন, “আমেরিকা চলে আসো।” আর আমি বলতাম, “না আন্টি, আমি দেশেই থাকতে চাই। পার্মানেন্টলি থাকার জন্য বিদেশ আমাকে টানে না।”
আজ থেকে বছর চারেক আগে হঠাৎ একদিন ফোন করে বললেন, উনার সেই ছোটবোন—যার মাঝে আমি এক দুর্লভ ব্যক্তিত্বের ছাপ দেখেছিলাম—তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
এত সুন্দর, এত স্মার্ট, এত মেধাবী, এত অমায়িক একজন মানুষ এত অল্প বয়সে চলে যেতে পারেন—আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। খুব অস্থির হয়ে জানতে চেয়েছিলাম, কীভাবে কী হলো।
আন্টি ওপাশ থেকে খুব শান্ত গলায় বললেন, “ক্যান্সার হয়েছিল। চিকিৎসা নিতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।”
উনার ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে দেখলাম—একদম গুছিয়ে বিদায় নিয়েছেন তিনি। ফেসবুকের পাসওয়ার্ড শেয়ার করা থেকে শুরু করে নিজের জন্য ‘শোক প্রকাশ’ অপশন চালু রাখা—পৃথিবীর সব দেনা-পাওনা যেন নিজেই চুকিয়ে দিয়ে গেছেন।
উনার এই অসম্ভব সুন্দর মৃত্যু নিয়ে অন্য একদিন বিস্তারিত লিখব। আমার ডেথ ফোবিয়া ছিল। এই প্রথম একজন মানুষকে দেখলাম, যিনি মৃত্যুকে এত সহজ ও সুন্দরভাবে গ্রহণ করেছেন। উনার এই মৃত্যু আমাকে অনেক ভাবিয়েছিল। ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু শিখেছিলাম—যা আজ অমূল্য।
দেশে ফেরার পর কোনোদিন সৌজন্য করেও উনার সঙ্গে কথা হয়নি। কিন্তু উনি জানলেন না—উনার মৃত্যু আমাকে কী গভীর এক “লাইফ লেসন” দিয়ে গেছে। কখনো আন্টিকেও তা বলা হয়নি।
ওই যে—সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেকটি পরিচয় ও সম্পর্কের পেছনে দারুণ কিছু লিখে রাখেন? হয়তো আমার এই “লাইফ লেসন”-টাও তেমনই এক সুন্দর উদ্দেশ্য।
যাইহোক, এত কথা আজ কেন লিখছি—এবার সেই কারণটা বলি।
ক’দিন ধরে আন্টিকে খুব মনে পড়ছিল। সেদিন ফোন করলাম। উনার কণ্ঠে আগের চেয়েও অনেক বেশি আন্তরিকতা। আরও বেশি আত্মবিশ্বাস। আরও গভীর স্নেহের সুর।
কথা বলতে বলতে খুব শান্ত, স্নিগ্ধ গলায় অবলীলায় বলে ফেললেন,
“আমার কেমো চলছে। ক্যান্সারটা একদম ফোর্থ স্টেজে। জীবনের শেষ অধ্যায়টা পার করছি।”
শুনে আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম। স্বাভাবিকভাবে কথা চালিয়ে গেলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক কথা হলো আমাদের। অথচ উনার কণ্ঠে নেই কোনো আফসোস, কোনো ভয়, কোনো অভিযোগ।
উনার ছোট বোনটাও ঠিক এভাবেই চলে গিয়েছিলেন।
পুরো কথোপকথনে একবার শুধু একটু কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,
“আস্তে আস্তে সব মায়াই কাটিয়ে উঠতে পারছি... শুধু আমার নাতনীটার জন্য একটু মায়া হচ্ছে। ওর বড় হওয়াটা দেখে যেতে পারলাম না। ও এখন কার্পেটের ওপর হাঁটতে হাঁটতে বলতে শিখেছে— ‘I have a story...’”
No comments:
Post a Comment